ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

রাজনগরে চীনা কনে, প্রবাসী বরের বিয়ে সম্পন্ন

মনজু বিজয় চৌধুরী, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

রাজনগরে চীনা কনে, প্রবাসী বরের বিয়ে সম্পন্ন

ছবি: বর্তমান বাংলাদেশ।

মৌলভীবাজারের রাজনগরে ভিন্নধর্মী এক আয়োজন ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। রাজনগরে কামারচাক ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপদ ধাম মন্দিরে হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রবাসী যুবক সুকান্ত সেন ও চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্রিস হুই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। উভয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও আস্থার ভিত্তিতেই তাদের এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং নতুন জীবনের সূচনায় তারা সবার আশীর্বাদ কামনা করেছেন।
জানা যায়, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে শতাধিক অতিথি ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। এর আগে কনে চিনা তরুণী ক্রিস হোয়েকে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে নিজ বাড়ি রাজনগর কামারচাক ইউনিয়নের টিকরপাড়া গ্রামে। প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানী সেনের ছেলে সুকান্ত কুমার সেন বৃহস্পতিবার বিদেশি নববধূকে নিয়ে আসলে- এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ। আকাশপথে কনের আগমনকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস।
বিয়ের পূর্বদিন অনুষ্ঠিত হয় গায়ে হলুদ। দেশীয় ঐতিহ্যে সাজানো আয়োজনে অংশ নেন দুই পরিবারের সদস্যরা। লাল বেনারসি শাড়িতে সজ্জিত কনে এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বরকে ঘিরে ছিল আনন্দঘন পরিবেশ। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সাত পাকে আবদ্ধ হন নবদম্পতি; পরে বর সিঁদুর পরিয়ে দেন কনের সিঁথিতে।
সুকান্ত সেন রাজনগরের টিকরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে পাড়ি জমান এবং সেখানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচয় হয় ক্রিস হুইয়ের সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্কে রূপ নেয় তাদের পথচলা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে চীনে তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে পারিবারিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য বাংলাদেশে আয়োজন করা হয় এ অনুষ্ঠান। বিয়েতে কনের পরিবারের সদস্যরাও চীন থেকে উপস্থিত ছিলেন। 
সুকান্তের পরিবার জানান, বাংলাদেশ বিবাহ অনুষ্ঠানে ক্রীসের সাথে তারা মা বাবা ও চাচা সঙ্গে এসেছেন। ২১ফেব্রুয়ারি গায়ে হলুদ ও ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বিষ্ণুপদ ধাম মন্দিরে সুকান্ত ও ক্রিস হুইয়ের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি বৌভাতের আয়োজন হয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। 
অন্যদিকে বর সুকান্ত সেন জানান, তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং উভয় পরিবারের সদস্যরা আনন্দঘন পরিবেশে এ আয়োজন উদ্যাপন করছেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে আমি চীনে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যাই এবং সেখানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। কয়েক বছর পর ক্রিসের সঙ্গে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে ভালো লাগা তৈরি হয়, যা একসময় গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়।
কনে: চীনা নাগরিক ক্রিস হুই বলেন, বাংলাদেশি তরুণ সুকান্ত সেনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন চীনা নাগরিক ক্রিস হুই। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বাংলাদেশে এসে তিনি বলেন, একজন বাংলাদেশিকে বিয়ে করে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এটি আমার জীবনের এক অসাধারণ মুহূর্ত। শুরুটা ছিল আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে; সময়ের পরিক্রমায় তা ভালোবাসায় রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায় বিয়েতে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আন্তর্জাতিক এ সম্পর্ককে ঘিরে এলাকায় এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এ আয়োজন। নবদম্পতির এ বন্ধন দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে। 
বরের সুকান্ত সেনের ছোট বোন ও সুকান্ত সেনের ছোট ভাই বলেন, ‘সে (ক্রিস হোয়ে) খুবই আন্তরিক। অল্প সময়ে আমাদের খুবই আপন করে নিয়েছে। ‘এই বিয়েতে আমরা খুশি। যে যার সঙ্গে ইচ্ছা সংসার করে ভালো থাকবে, সে রকমই হওয়া উচিত।’
সুকান্ত সেনের মা শিল্পী রানী সেন বলেন,“আমি খুবই আনন্দিত ও গর্বিত। আমাদের পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলের বিয়েতে নতুন একজন সদস্য আমাদের পরিবারে যোগ হয়েছে এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়। আমার ছেলের স্ত্রী আমার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে। 
কামারচাক ইউনিয়নের বিষ্ণুপদ ধাম মন্দিরে পুরোহিত কিশোর কান্তি ভট্রাচার্য বলেন আমি বহু বাঙালি দম্পতির বিয়ে সম্পন্ন করেছি। তবে এই প্রথম কোনো চীনা নাগরিকের বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সৌভাগ্য হলো। চীনা নাগরিক ক্রিস হুইয়ের মা-বাবা, কাকা ও কাকিও এ বিয়েতে উপস্থিত রয়েছেন। কনের বাবা আমাকে কন্যাদানের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাই আমি পুরোহিত হিসেবে ক্রিস হুইয়ের কন্যাদান সম্পন্ন করব।

বর্তমান বাংলাদেশ

Link copied!