নাটোরের রাজনীতিতে যুক্ত হলো এক নতুন গৌরবগাথা। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। বাবার রাজনৈতিক আসন নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) থেকে বিজয়ী হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় জেলায় বইছে আনন্দের জোয়ার।
সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা হতেই লালপুর ও বাগাতিপাড়া জুড়ে শুরু হয় উদযাপন। দলীয় নেতাকর্মীরা মিছিল ও শোভাযাত্রা বের করেন। বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ, দোয়া মাহফিল ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। লালপুর বাজার, বাগাতিপাড়া উপজেলা সদর এবং আশপাশের গ্রামগুলোতে দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা থেকে একই সঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রতিমন্ত্রিত্ব পাওয়া বিরল ঘটনা। বাগাতিপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমাদের মেয়ে আজ দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পদপ্রাপ্তি নয়; পুরো নাটোর জেলার মানুষের জন্য গর্ব ও সম্মানের বিষয়।” তিনি পুতুলকে শিক্ষিত, মেধাবী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর মাধ্যমে নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
পারিবারিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের রাজনৈতিক পথচলায় রয়েছে শক্তিশালী পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর পিতা ফজলুর রহমান পটল একসময় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এলাকায় ক্রীড়া ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা এখনো স্মরণ করেন স্থানীয়রা। বাবার সেই আসন থেকেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুতুলের মন্ত্রিত্ব পাওয়াকে অনেকেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় শিক্ষক নেতা সাজেদুর সাজ্জাদ বলেন, “আমরা চাই নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়ুক। পুতুলের নেতৃত্বে এ খাতে নতুন কর্মসূচি ও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ আসবে বলে আশা করছি।”
প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা
মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ—দুটি মন্ত্রণালয়ই সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা, দুস্থ সহায়তা কর্মসূচি—সবকিছুই এই খাতের আওতায়। ফলে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পুতুলকে ঘিরে প্রত্যাশা অনেক বেশি।
তরুণ সমাজকর্মী রাবেয়া খাতুন সুরভী বলেন, “একজন শিক্ষিত ও পেশাদার নারী নেতৃত্ব পাওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও আত্মকর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে শুভেচ্ছার বন্যা। অনেকেই মন্তব্য করছেন, উত্তরাঞ্চলের নারী নেতৃত্ব হিসেবে পুতুল নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে গৌরবের পাশাপাশি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আশ্রয়কেন্দ্র ও হেল্পলাইন ব্যবস্থার জোরদারকরণ, সমাজকল্যাণ ভাতার স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করা—এসবই হবে তাঁর অগ্রাধিকারমূলক কাজ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন।
এছাড়া স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা—প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে নাটোর-১ আসনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার ঘটবে। বিশেষ করে লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
উৎসবের আবহে ভবিষ্যতের অপেক্ষা
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর নাটোরে এখনো উৎসবের রেশ কাটেনি। নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই আশা করছেন, বাবার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধারণ করে ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি নিজ জেলা নাটোরের উন্নয়নে রাখবেন দৃশ্যমান অবদান।
এখন দেখার পালা—প্রত্যাশার এই পাহাড়সম দায়িত্ব কেমনভাবে সামাল দেন নতুন প্রতিমন্ত্রী। তবে আপাতত নাটোরবাসী আশাবাদী—তাঁর হাত ধরেই নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ খাতে সূচিত হবে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়।

আপনার মতামত লিখুন :