ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্ক-হিসাব। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনে এবার দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনী সমীকরণে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। ফলে ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতা।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা। প্রায় আড়াই হাজার পোস্টাল ভোটারসহ মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৮ জন। দুই উপজেলায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৬৩টি। এবারের নির্বাচনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধানের শীষ), বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মহসিন মিয়া মধু (ফুটবল), জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রীতম দাস (শাপলা কলি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা নূরে আলম হামিদী (রিকশা), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান (মই) এবং জাতীয় পার্টির মো. জরিফ হোসেন (লাঙ্গল)।
স্বাধীনতার পর সংখ্যালঘু ও চা-শ্রমিক ভোটব্যাংককে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল এ আসনটি। তবে এবার দলটির প্রার্থী না থাকায় ভোটারদের মধ্যে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, মুজিবুর রহমান চৌধুরী ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এ আসনে নির্বাচন করে আসছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। ২০০১, ২০০৯ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কারচুপির মাধ্যমে পরাজিত হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের। পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার কথাও প্রচারে তুলে ধরা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, অতীত রাজনৈতিক ত্যাগ এবং দলীয় প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন—এমন মত দিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন ভোটার।
অন্যদিকে, সাবেক শ্রীমঙ্গল পৌর মেয়র মহসিন মিয়া মধু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আত্মীয়-স্বজনের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেই তিনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
এছাড়া ১১ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে মাঠে আছেন এনসিপির প্রীতম দাস ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা নূরে আলম হামিদী। তবে তৃণমূল পর্যায়ে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুর রব সক্রিয় থাকলেও জোটগত অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় তাদের সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হলেও ফুটবল, রিকশা ও শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থান ঘিরে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার আভাস মিলছে। অন্যদিকে বাসদ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে থাকলেও তাদের প্রচার-তৎপরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনে এবার ভিন্নধর্মী নির্বাচনী লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে ভোটারদের রায়—এখন সে দিকেই তাকিয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের মানুষ।

আপনার মতামত লিখুন :